নিরাপদ বাহন হিসেবে দেশের মানুষের কাছে ট্রেন খুবই জনপ্রিয়। তবে বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা মানুষের সে বিশ^সে চিড় ধরিয়ে দেয়। সম্প্রতি গাজীপুরের জয়দেবপুর স্টেশনের দক্ষিণ আউটার সিগন্যালে ছোট দেওড়ার কাজীবাড়ি এলাকায় মালবাহী ও যাত্রীবাহী ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। দুর্ঘটনায় যাত্রীবাহী টাঙ্গাইল কমিউটারের ৩টি বগি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। লাইনচ্যুত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৯টি বগি। দুর্ঘটনার সাড়ে ৩১ ঘণ্টা পর শেষ হয় উদ্ধারকাজ। এই ঘটনার পরদিনই সিরাজগঞ্জের বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম রেলওয়ে স্টেশনে কলকাতা থেকে ঢাকাগামী মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেনটি স্টেশনের ৫ নম্বর লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল। দায়িত্বে থাকা স্টেশন মাস্টার ও পয়েন্টসম্যানের ভুল সিগন্যালের কারণে ঢাকা থেকে রাজশাহীগামী ধুমকেতু এক্সপ্রেস ট্রেনটি একই লাইনে প্রবেশ করে। তবে চালক একই লাইনে আরেকটি ট্রেন দেখতে পেয়ে দ্রুত থামিয়ে দেওয়ায় মুখোমুখি সংঘর্ষের হাত থেকে ট্রেন দুটি রক্ষা পায়। গত বছরের ২৩ অক্টোবর কিশোরগঞ্জের ভৈরবে আন্তঃনগর এগারোসিন্ধুর এক্সপ্রেস ও একটি মালবাহী ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষে ২২ জন নিহত এবং বহু যাত্রী হতাহত হয়। তদন্তে সিগন্যাল অমান্য করে স্টেশনে প্রবেশ করা এবং সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বহীনতাকে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। দুই ট্রেনের এমন সব সংঘর্ষের ঘটনা দিনকে দিন বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছে, অ্যানালগ সিগন্যাল পদ্ধতির কারণে এ ধরনের দুর্ঘটনা বাড়ছে। জানা যায়, গত একযুগে রেলের উন্নয়নে খরচ হয়েছে দেড় লাখ কোটি টাকা। রেলে বিনিয়োগে অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে গেলেও সিগন্যাল ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়েছে সামান্য। অনেক জায়গায় ম্যানুয়াল পদ্ধতিতেই চালানো হচ্ছে ট্রেন। এতে ছোট ভুলে ঘটছে বড় দুর্ঘটনা। ডিজিটাল যুগে এসব অ্যানালগ সিগন্যাল পদ্ধতিকে একেবারেই অকার্যকর বলছেন অনেকে। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে যেসব ট্রেন দুর্ঘটনায়, অনুসন্ধানে দেখা গেছে সেগুলোতে দায় ছিল সিগন্যাল ব্যবস্থার। দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে ত্রুটিপূর্ণ সিগন্যাল ব্যবস্থাকে দায়ী করা হয়। সনাতন সিগন্যাল পদ্ধতি, পয়েন্টসম্যানের ভুল বা সিগন্যালম্যানের ভুলের কারণে এসব দুর্ঘটনা ঘটছে। বেশ কিছু জায়গায় ডিজিটাল সিগন্যাল পদ্ধতি চালু হলেও রেলের উন্নয়ন কাজ চলমান থাকায় সেসব এখন বন্ধ। বাধ্য হয়ে সনাতনী বা অ্যানালগ পদ্ধতিতে ট্রেন প্রবেশ বা ক্রসিং করানো হচ্ছে। এতে সামান্য ভুলেই বাড়ছে দুর্ঘটনা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল সিগন্যাল পদ্ধতি সম্পূর্ণ চালু না হওয়া, রেলের কর্মচারীদের দক্ষ করে গড়ে না তোলা আর দায়িত্বহীনতাই এসব দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। রেল কর্মচারীরা বলছেন, যেসব স্থানে ডিজিটাল সিগন্যাল সিস্টেম নেই, সেসব স্থানে সিগন্যালম্যানরা হাত বাতি জ¦ালিয়ে ট্রেনকে নির্দেশনা দেবেন। এটাই নিয়ম। যদি সিগন্যালম্যানের হাতে সিগন্যাল বাতি না থাকে সেক্ষেত্রে জরুরি ভিত্তিতে ট্রেন থামানোর প্রয়োজন হলে রেল লাইনের মাঝে দাঁড়িয়ে দুই হাত উঁচু করে প্রদর্শন করবেন। আবার রাতে যদি জরুরি লাল সিগন্যাল বাতি না থাকে সেক্ষেত্রে কাপড়ে আগুন ধরিয়ে প্রদর্শন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কাছে কোনো কাপড় পাওয়া না গেলে গায়ে থাকা কাপড় খুলে তাতে আগুন ধরিয়ে প্রদর্শন করতে হবে। এমন সব মান্ধাতার আমলের নিয়মেই এখনো চলছে ট্রেন। ট্রেনের পরিচালকরা বলছেন, মুখোমুখি সংঘর্ষ দুটি কারণে হতে পারে। চালক যদি সিগন্যাল অমান্য করেন অথবা স্টেশন মাস্টার যদি সিগন্যাল দিতে ভুল করেন। ক্রসিংয়ে যখন লাল বাতি সিগন্যাল থাকবে, তখন প্রবেশ করা যাবে না। লাল মানেই বিপজ্জনক। হলুদ সংকেত পেলে ধীরে ধীরে ট্রেন থামাতে হবে। সবুজ সংকেতে ট্রেন চলতে পারবে। এছাড়া মুখোমুখি সংঘর্ষের বিষয়ে ট্রেন চালকরা বলছেন, ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনায় চালকের ত্রুটি খুঁজে পাওয়া কষ্টকর। এ ক্ষেত্রে চালকের দোষ থাকে না বললেই চলে। কারণ পয়েন্ট (চলাচলের অনুমতি) পাওয়ায় পরই কেবল চালক লাইন দিয়ে চলাচল করেন। ট্রেনযাত্রা শুরুর আগেই স্টেশন মাস্টার কর্তৃক এই অনুমতি দেওয়া হয়। কাজেই অনুমতি ব্যতীত চলাচলের কোনো সুযোগ নেই। যারা পয়েন্ট তৈরি করেন বা যে স্টেশন মাস্টার পয়েন্ট দেন, তাদের ভুলের কারণেই এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে। ট্রেন চালকরা আরও জানান, একজন ট্রেনের চালক চলাচলের অনুমতি পাওয়ায় পরও সিগন্যাল দেখে সেই রাস্তায় ট্রেন প্রবেশ করান। এখন চালককে যদি ভুল পয়েন্ট দেওয়া হয় আবার সিগন্যালও না দেওয়া হয়, তাহলে দোষটা চালকের হতে পারে না। রেলওয়ের মহাপরিচালক সরদার সাহাদাত আলী বলেন, গাজীপুরের দুর্ঘটনাস্থলে কাজ চলছিল, ডিজিটাল সিগন্যাল সিস্টেম বন্ধ ছিল। আরও কিছু জায়গায় প্রকল্পের কাজ চলমান থাকায় সেগুলোও ম্যানুয়ালি চলছে। যারা সিগন্যাল দেওয়ার দায়িত্বে তাদের ভুলে এরকম হচ্ছে। আমরা সবাইকে সতর্ক করছি। যেন এরকম ভুল আর না হয়। স্টেশন মাস্টারদের নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা দুর্বল ও ওয়াকিটকি কাজ না করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি কিছুদিন আগে জানতে পেরেছি কিছু ওয়াকিটকি কাজ করছে না। যেগুলো কাজ করছে না সেগুলো চেঞ্জ করে নিতে বলা হয়েছে। আর ওয়াকিটকির পাশাপাশি মোবাইলও দেওয়া আছে। যেহেতু ভুল হচ্ছে, আমরা মনিটরিং বাড়াচ্ছি। এসব দুর্ঘটনা প্রতিকারের উপায় সম্পর্কে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, উন্নয়ন কার্যক্রম মাথায় রেখেই আমাদের কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। একটি লাইনে আরেকটি ট্রেন ঢুকে যায়। এতে বড় ধরনরে দুর্ঘটনা ঘটে। রেলে পয়েন্ট এণ্ড ক্রসিং এক-তৃতীয়াংশ এখনো কম্পিউটার সিস্টেমে করা হয়নি। উন্নয়ন কার্যক্রম পরিকল্পিতভাবে করতে হবে। যেসব স্থানে ম্যানুয়ালি সিস্টেম করা, সেসব স্থান দ্রুত অটোমেশনের আওতায় আনতে হবে। এই অধ্যাপক বলেন, রেলে বিনিয়োগে ঘাটতি নেই। তবে পয়েন্ট অ্যান্ড ক্রসিং সিস্টেমে বিনিয়োগের ঘাটতি রয়েছে। সেখানে যারা দায়িত্ব পালন করছেন তারা অপেশাদার, অদক্ষ। এসব কর্মচারীকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমরা অবকাঠামো উন্নয়নের দিকে বেশি নজর দেই। রেলের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রকে আধুনিকায়ন করা জরুরি। উন্নয়ন কাজ শুরুর আগেই কর্তৃপক্ষের জানা ছিল যে এসব স্থানে ম্যানুয়ালি অপারেট করতে হবে, তাহলে কেন সেসব জনবলকে প্রশিক্ষিত করা হলো না -এমন প্রশ্ন তোলোন তিনি। ট্রেনের লাইন ক্রসিংয়ের কাজ ম্যানুয়ালি করতে হলে অপারেটরদের দক্ষ ও প্রশিক্ষিত করা তোলায় জোর দেন তিনি।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

বরাদ্দ বাড়লেও বদলাচ্ছে না রেল সিগন্যালের পুরোনো পদ্ধতি
- আপলোড সময় : ২২-০৫-২০২৪ ০৩:১৮:৩৭ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ২২-০৫-২০২৪ ০৩:১৮:৩৭ অপরাহ্ন


কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ